আর্থিক সংকটে পড়া সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর জমি, সরকারি ট্রেজারি বন্ড, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন সম্পদ ধাপে ধাপে বিক্রি করে সেই অর্থ পৃথক ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে। পরে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট (এফআইএফও)’ পদ্ধতিতে আগে জমা হওয়া দাবিগুলো আগে পরিশোধ করা হবে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) আইডিআরএ কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় এসব পরিকল্পনার কথা বলেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন।
দীর্ঘদিন ধরে অর্থ ফেরতের অপেক্ষায় থাকা লাখো বীমা গ্রাহকের জন্য এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশার সঞ্চার করেছে। একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে ‘শুধু সম্পদ বিক্রি করেই কি এই সংকটের ন্যায়সঙ্গত সমাধান সম্ভব?’ ভূক্তভোগী কোম্পানিগুলোর প্রশ্ন ‘যারা কোম্পানির সম্পদে হাত দিয়েছে, তাদের সম্পদে হাত পড়বে কবে?’
যতদূর জানা যায়, যে কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত, তারা একদিনে এই অবস্থায় আসেনি। বছরের পর বছর অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, স্বজনপ্রীতি এবং দুর্বল করপোরেট সুশাসনের অভিযোগ রয়েছে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে। কিছু ঘটনায় তদন্ত হয়েছে, কিছু ঘটনায় মামলাও হয়েছে। কোথাও কোথাও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষ। অর্থাৎ সংকটের পেছনে মানবসৃষ্ট কারণের অভিযোগ অনেকাংশে দায়ী।
কিন্তু আইডিআরএর ঘোষিত পরিকল্পনায় একটি মৌলিক বিষয় অনুপস্থিত। কোম্পানির সম্পদ বিক্রির কথা বলা হলেও, যাঁদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ বা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের কাছ থেকে সেই অর্থ উদ্ধারের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বেআইনিভাবে কোম্পানির অর্থ আত্মসাৎ করে থাকে, তবে তার দায় কেন শেষ পর্যন্ত কোম্পানি ও নিরীহ গ্রাহকদের ওপর বর্তাবে?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করা নয়, বরং যারা কোম্পানিকে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা। প্রয়োজন হলে তাদের সম্পদ জব্দ, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ উদ্ধার এবং সেই অর্থ কোম্পানির তহবিলে ফেরত আনার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় একটি ভুল বার্তা যাবে—অনিয়ম করে কোম্পানিকে ধ্বংস করা যাবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দায় বহন করবে প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ গ্রাহক।
বীমা খাতের সংকটে রাষ্ট্রীয় সহায়তা-
ব্যাংক খাতে সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময় বিশেষ আর্থিক সহায়তা, পুনর্গঠন বা তারল্য সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বীমা খাতের ক্ষেত্রে এমন কোনো নীতিগত উদ্যোগের আলোচনা খুব একটা দেখা যায় না। বর্তমান আইনে যদি সুযোগ সীমিত থাকে, তাহলে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ বীমা গ্রাহকদের সঞ্চিত অর্থও দেশের আর্থিক ব্যবস্থারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই সংকট কেবল সাতটি কোম্পানির নয়; এটি গোটা বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট। সেই আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে শুধু সম্পদ বিক্রি করে দাবি পরিশোধ করলেই হবে না। সমান গুরুত্ব দিতে হবে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম রোধে কঠোর সংস্কার নিশ্চিত করার ওপর।
বীমা মানুষের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে নিরীহ গ্রাহকের পাশাপাশি আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে অনিয়মের জন্য দায়ীদেরও। কেবল সম্পদ বিক্রি নয়—আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারের মধ্য দিয়েই প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
প্রশান্ত সুভাষ চন্দ
সম্পাদক নিউজ লাইভ বিডি















