স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নোয়াখালী-৫ আসনটি শুধু একটি সংসদীয় আসন নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই আসনের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ের নির্বাচিত সরকারে এ আসনের সরকার দলীয় প্রতিনিধিরা কখনো মন্ত্রী, কখনো প্রতিমন্ত্রী, আবার কখনো সরকারের শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তবে ২০২৬ সালে এসে সেই ধারায় ছেদ পড়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারে নোয়াখালী-৫ আসন থেকে নির্বাচিত এমপি মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। ফলে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্যের এই আসন কি এবার মন্ত্রীশূন্যই থাকবে?
স্থানীয়দের দাবি, নোয়াখালী-৫-এর ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় এ আসনের এমপিকে সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে এলাকার মানুষের প্রত্যাশা যেমন পূরণ হবে, তেমনি জাতীয় রাজনীতিতেও নোয়াখালীর প্রতিনিধিত্ব আরও দৃশ্যমান হবে।
জিয়াউর রহমানের আমলে মওদুদ, শুরু হয় মন্ত্রিত্বের ধারাবাহিকতা:
১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জয় লাভ করে। দলটি ৩০০টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন লাভ করে। ওই নির্বাচনে নোয়াখালী-৫ থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।
এরপর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৯ সালের ১৫ এপ্রিল মওদুদ আহমদ উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অর্থাৎ নোয়াখালী-৫-এর এমপি হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান শুধু সংসদে সীমাবদ্ধ থাকেনি, খুব দ্রুতই তিনি সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদে চলে আসেন।
এরশাদ আমলেও মওদুদ—তবে আসন ছিল নোয়াখালী-১
এরশাদ আমলের ইতিহাসে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে মওদুদ আহমদ নোয়াখালী-৫ ও নোয়াখালী-১ আসন থেকে প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে নোয়াখালী-৫ আসনটি ছেড়ে দিয়ে তাঁর স্ত্রী হাসনা জসীম উদ্দিন মওদুদকে প্রার্থী করিয়ে নির্বাচিত করেছিলেন। তবে ওই সরকারের আমলেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন।
১৯৮৬ সালের ৯ জুলাই তিনি উপপ্রধানমন্ত্রী এবং শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। ১৯৮৮ সালের ২৭ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৮৯ সালের ১২ আগস্ট পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে পরে ভাইস প্রেসিডেন্ট হন।
অর্থাৎ নোয়াখালী-৫-এর সঙ্গে মওদুদ আহমদের রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বৃহত্তর নোয়াখালীর একজন নেতা হিসেবে জাতীয় ক্ষমতার কেন্দ্রেও তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।
১৯৯১: আবার নোয়াখালী-৫, আবার মওদুদ:
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এরশাদ সরকারের পতনের পর বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন আয়োজন করে। ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে মওদুদ আহমদ আবার নোয়াখালী-৫ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তবে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে। ফলে ১৯৯১-৯৬ পর্যন্ত আসনটি মন্ত্রীত্বশূন্য ছিল।
১৯৯৬: শেখ হাসিনা সরকারে ওবায়দুল কাদের
১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে নোয়াখালী-৫ থেকে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের ওবায়দুল কাদের। নির্বাচনের মাত্র ১১ দিন পর, ২৩ জুন ১৯৯৬, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একই দিনে ওবায়দুল কাদেরকে যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ২০০১ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত ওই দায়িত্বে ছিলেন।
২০০১: আবার মওদুদ, এবার পূর্ণ মন্ত্রী
২০০১ সালের ১০ অক্টোবর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। সেই নির্বাচনে নোয়াখালী-৫ থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। নির্বাচনের পর খালেদা জিয়া তাঁকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী করেন। ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। ফলে নোয়াখালী-৫ থেকে নির্বাচিত একজন এমপির মন্ত্রিসভায় যাওয়ার যে দীর্ঘ রাজনৈতিক ধারা, ২০০১ সালের পর্বে তা আবারও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
২০০৮: ওবায়দুল কাদেরের প্রত্যাবর্তন
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে এবং ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নোয়াখালী-৫ থেকে নির্বাচিত হন ওবায়দুল কাদের। তবে এবার তাঁকে শুরুতেই মন্ত্রী করা হয়নি। ২০১১ সালের নভেম্বরে তিনি মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং ২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তিনি আবার নোয়াখালী-৫ থেকে নির্বাচিত হন এবং ১২ জানুয়ারি যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। পরে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন হয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় হলে তিনি সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকেন।
এরপর ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও ওবায়দুল কাদের নোয়াখালী-৫ থেকে নির্বাচিত হন এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে অবশ্য বিএনপি আসনটি পুনরুদ্ধার করে।
২০২৬: প্রথমবার মন্ত্রীশূন্য নোয়াখালী-৫?
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৫ থেকে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম নির্বাচিত হন। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। কিন্তু নতুন মন্ত্রিসভায় নোয়াখালী-৫-এর এমপি মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম স্থান পাননি। ফলে স্বাধীনতার পর এই আসনের নির্বাচিত এমপিদের জাতীয় সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার যে দীর্ঘ ইতিহাস, ২০২৬ সালে এসে সেখানে একটি ব্যতিক্রম তৈরি হয়েছে।
কেন নোয়াখালী-৫ গুরুত্বপূর্ণ?
নোয়াখালী-৫ আসনটি বর্তমানে কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলা নিয়ে গঠিত। ভৌগোলিক অবস্থান, নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দীর্ঘদিনের জাতীয় রাজনীতির প্রভাব—সব মিলিয়ে আসনটি জেলার রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এর ওপর রয়েছে আসনটির রাজনৈতিক ইতিহাস। মওদুদ আহমদ ও ওবায়দুল কাদের—বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির অত্যন্ত পরিচিত দুই নেতা—তারা এই আসনকে দীর্ঘ সময় জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছেন। তাই স্থানীয়দের মনে করছেন, মন্ত্রিসভায় নোয়াখালী-৫-এর প্রতিনিধিত্ব না থাকা শুধু একটি রাজনৈতিক পদ না পাওয়ার বিষয় নয়; এটি নোয়াখালীর জাতীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও।
ঐতিহ্য বনাম নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা:
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু ‘একটি আসন থেকে এমপি হয়েছেন, তাই মন্ত্রী হতে হবে’—এভাবে দেখার সুযোগ নেই। মন্ত্রিসভা গঠন প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত; সেখানে দলীয় ভারসাম্য, ব্যক্তিগত যোগ্যতা, আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব, রাজনৈতিক কৌশল এবং সরকারের প্রয়োজন—সবকিছু বিবেচনায় আসে। তারপরও নোয়াখালী-৫-এর ইতিহাস একটি আলাদা রাজনৈতিক বার্তা দেয়। ১৯৭৯ সালে মওদুদ আহমদের মাধ্যমে এই আসনের এমপির জাতীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রবেশ; ১৯৯৬ সালে ওবায়দুল কাদেরের প্রতিমন্ত্রী হওয়া; ২০০১ সালে মওদুদের পূর্ণ মন্ত্রী হওয়া; এবং ২০১১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ওবায়দুল কাদেরের মন্ত্রিত্ব—সব মিলিয়ে মন্ত্রিসভায় এ আসনের প্রতিনিধিত্ব প্রায় একটি রাজনৈতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল।
স্থানীয়দের মাঝে এখন প্রশ্ন একটাই—নোয়াখালী-৫ কি দীর্ঘদিনের সেই মন্ত্রিত্বের ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলল, নাকি ভবিষ্যতে কোনো পর্যায়ে আবারও এই আসনের এমপির জন্য খুলবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দরজা?
তাদের দাবি, সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর; কিন্তু নোয়াখালী-৫-এর দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের কারণে মন্ত্রিসভায় এ আসনের একজন প্রতিনিধির প্রত্যাশা যে অমূলক নয়, সেটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
প্রশান্ত সুভাষ চন্দ 












